মূল অংশে যান
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ Monday, 19 October 2026
নোটিশ
ভৈরবে ১৭ মামলার আসামি, চুরি ও ছিনতাইয়ের গডফাদার মেরাজ পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তারভৈরবে চাঁদা না পেয়ে কারখানা মালিককে পিটিয়ে জখম, ১৬ লক্ষ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগবাংলাদেশের শিল্পায়ন ও জনকল্যাণের অগ্রপথিক আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম (লেখক:- মোহাম্মদ খলিলুর রহমান)ভোর থেকে পূজামণ্ডপে কঠোর নজরদারির নির্দেশ ভৈরবে প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমেরভৈরবে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে চালক প্রশিক্ষণ, রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং দক্ষ চালককে সংবর্ধনাকিশোরগঞ্জে লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস পালিতভৈরবে মানারাত পাবলিক স্কুলে English and Arabic Festival 2026 অনুষ্ঠিতডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার আহ্বান

কটিয়াদীতে চারশত বছরের ঢাকের হাটের ঐতিহ্য

প্রকাশ: ১৭ বার পঠিত
শেয়ারWhatsAppTelegramLinkedIn
Oplus_131072

# সারোয়ার হোসেন শাহীন :-

হাটজুড়ে ঢাকের গর্জন, ঢোলের বাদন, সানাইয়ের সুর আর বাঁশির মূর্ছনা। একদল ঢাকি তালে তালে বাজিয়ে চলেছেন ঢাক, অন্যদিকে ঢোল, ড্রাম ও নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর চারপাশ। কোথাও চলছে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রতিযোগিতা, কোথাও পূজার আয়োজকদের সঙ্গে দর-কষাকষি। বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত সুরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। দুর্গাপূজা আসার আগেই এমন দৃশ্যের দেখা মেলে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাটে’। প্রায় চারশ বছরের পুরোনো এই হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা। তাঁদের বাজনা শুনে পছন্দের দল বেছে নেন পূজার আয়োজকেরা। দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দলের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী নির্ধারিত হয় পারিশ্রমিক। কোনো কোনো দলের বায়না লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই হাট এখন শুধু ঢাকি-বাদকদের মিলনমেলা নয়, কটিয়াদীর ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজপ্রাসাদের দুর্গাপূজা থেকে ঢাকের হাটের সূচনা

স্থানীয় জনশ্রুতি ও প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীতে কটিয়াদীর চারিপাড়া গ্রামে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকি ও বাদকদল আসতেন। সে সময় যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল নৌপথ। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী যাত্রাঘাট এলাকায় নৌকায় করে ঢাক, ঢোল, বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে জড়ো হতেন তাঁরা।

কথিত আছে, রাজা নিজে ঢাকি ও বাদকদের বাজনা শুনতেন। তাঁদের পরিবেশনা যাচাই করে পছন্দের দলকে রাজপ্রাসাদের দুর্গাপূজায় নিয়ে যেতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সমবেত হওয়ার একটি নির্দিষ্ট আয়োজন গড়ে ওঠে, যা কালক্রমে ‘ঢাকের হাট’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

পরবর্তী সময়ে এলাকায় দুর্গাপূজার সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জমিদার ও পূজার আয়োজকদের মধ্যে ঢাকি বাছাই এবং হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে নানা মতপার্থক্য দেখা দেয়। একপর্যায়ে যাত্রাঘাট থেকে হাটটি স্থানান্তরিত হয়ে কটিয়াদী পুরাতন বাজারে স্থায়ী রূপ পায়। দীর্ঘদিন ধরে এখানেই চলে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, সময়ের পরিবর্তনে পূজার আয়োজন, যোগাযোগব্যবস্থা ও মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এলেও ঢাকের হাটের আবেদন কমেনি। বরং প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে এই হাটকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি হয় বাড়তি উৎসাহ। হাটের দিন কটিয়াদী বাজার ও আশপাশের এলাকায় উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে।

বাদ্যযন্ত্র বিক্রি নয়, চলে বায়না ও পারিশ্রমিকের দর-কষাকষি

নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে ঢাক বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। মূলত দুর্গাপূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় বাদ্যযন্ত্র বাজানোর জন্য ঢাকি ও বাদকদল ভাড়া নেওয়া হয়। পূজার আয়োজকেরা হাটে এসে দলগুলোর বাজনা শোনেন, সদস্যসংখ্যা ও দক্ষতা যাচাই করেন এবং পছন্দ অনুযায়ী চুক্তি করেন।

দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের বৈচিত্র্য, বাজানোর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পূজার দিনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে বায়নার পরিমাণ। সাধারণত একটি দলের পারিশ্রমিক ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। ফলে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের জন্য এই হাট হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে ঢাকের ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পূজামণ্ডপের পরিবেশ সৃষ্টি, আরতি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় ঢাকের তালের সঙ্গে যুক্ত হয় ঢোল, সানাই, বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র। তাই পূজার আয়োজকদের কাছে দক্ষ ঢাকি ও বাদকদল নির্বাচনও প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসেন ঢাকি ও বাদকরা

দুর্গাপূজার আগে কটিয়াদীর এই হাটে ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা আসেন ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। অন্যদিকে পছন্দের দল বায়না করতে আসেন নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার পূজার আয়োজকেরা। ফলে হাটটি পরিণত হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাদ্যযন্ত্রশিল্পী ও পূজা উদযাপনকারীদের মিলনকেন্দ্রে।

হাটে আসা প্রতিটি দলই চায় নিজেদের বাজনা দিয়ে আয়োজকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। একদল যখন ঢাকের তালে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরে, অন্য দল তখন ঢোল, সানাই কিংবা বাঁশির সুরে মাতিয়ে তোলে চারপাশ। পূজার আয়োজকেরা একাধিক দলের বাজনা শুনে তুলনা করেন। এরপর নিজেদের সামর্থ্য ও চাহিদা অনুযায়ী বায়না চূড়ান্ত করেন।

এতে একদিকে যেমন পূজার আয়োজকেরা একই স্থানে বহু দলকে যাচাই করার সুযোগ পান, অন্যদিকে ঢাকি ও বাদকরাও তাঁদের দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারেন।

৬০ হাজার টাকার কমে বায়না নয় নিতাই রায়ের দলের

মুন্সিগঞ্জ থেকে তিন সদস্যের একটি বাদকদলের নেতৃত্ব দিয়ে হাটে এসেছেন নিতাই রায়। তাঁর ভাষ্য, এবার পূজার আয়োজন বেশি হওয়ায় বাদকদলের চাহিদাও বেড়েছে। তাঁর দলের জন্য কোনো কোনো আয়োজক ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দিতে চেয়েছেন। তবে ৬০ হাজার টাকার কমে তাঁরা চুক্তি করবেন না বলে জানান তিনি।

গোপালগঞ্জ সদর থেকে সাত সদস্যের একটি দল নিয়ে এসেছেন আরেক বাদকদলের নেতা। তিনি জানান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো তাঁর মূল পেশা নয়। শখের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য তিনি এই কাজ করেন। দুর্গাপূজার মৌসুমে বিভিন্ন জায়গায় বায়না পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রতিবছরই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।

নরসিংদীর মনোহরদী থেকে আট সদস্যের একটি দল নিয়ে এসেছেন ফারুক মিয়া। তিনি জানান, প্রায় এক যুগ ধরে তাঁরা এই হাটে আসছেন। এবার তাঁর দলের জন্য কেউ কেউ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দিতে চেয়েছেন। তবে এক লাখ টাকার কমে দল নিয়ে যাবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

তাঁদের কথায়, এই হাটে এসে শুধু বায়না পাওয়ার সুযোগই তৈরি হয় না, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরারও সুযোগ মেলে।

‘এক জায়গায় এত ঢাকি-বাদক পাওয়া যায় না’

নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে পূজার জন্য বাদ্যযন্ত্রের দল বায়না করতে এসেছেন উৎপল কুমার। তিনি বলেন, “এই হাটে শ’য়ে শ’য়ে ঢাকি ও বাদককে একসঙ্গে পাওয়া যায়। বাড়তি পাওনা হিসেবে আমরা বাজনা পরখ করে নিতে পারি। তাই এই হাট থেকে প্রতি বছরই পূজার জন্য ঢাক-ঢোল বায়না করে নিয়ে যাই। এবারও এসেছি।”

তাঁর মতে, অন্য কোথাও আলাদাভাবে বিভিন্ন দলের খোঁজ নেওয়া, তাদের বাজনা শোনা এবং পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনা করা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু কটিয়াদীর ঢাকের হাটে একই জায়গায় অনেক দল পাওয়া যায়। এতে পছন্দের দল নির্বাচন ও বায়না চূড়ান্ত করা সহজ হয়।

ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ

প্রায় চারশ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই হাট কটিয়াদীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এখানে যেমন দুর্গাপূজার বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি নতুন প্রজন্মও পরিচিত হয় বাংলার লোকজ বাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে। তবে এই ঐতিহ্যকে আরও সুসংগঠিতভাবে ধরে রাখতে প্রয়োজন উন্নত ব্যবস্থাপনা, শিল্পীদের জন্য উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সংরক্ষণের উদ্যোগ।

হাটকে কেন্দ্র করে আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো গেলে দূরদূরান্ত থেকে আসা শিল্পীদের দুর্ভোগ কমবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পাশাপাশি ঢাকের হাটের ইতিহাস নথিবদ্ধ করা এবং এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি রয়েছে স্থানীয়দের।

কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা জানান, দুর্গাপূজা উদযাপনকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, “এই হাট কটিয়াদীর ঐতিহ্য। ঐতিহ্যবাহী ঢাক-ঢোলের হাটটি পরিদর্শন করেছি। ঢাকের হাটের আবাসন ব্যবস্থার অসমাপ্ত কাজ শিগগিরই সম্পন্ন করা হবে।”

ঐতিহ্যের সুর বাঁচিয়ে রাখার প্রত্যাশা

সময়ের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের ধরন, পূজার আয়োজন ও মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু দুর্গাপূজার সঙ্গে ঢাকের যে ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক, তা এখনো অটুট। কটিয়াদীর ঢাকের হাট সেই সম্পর্ককে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলেছে।

প্রতিবছর হাটে ঢাকের তালে তালে জমে ওঠে বায়না, তৈরি হয় নতুন কর্মসম্পর্ক, আর জীবিকার সন্ধানে আসা শিল্পীরা ফিরে যান কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে। তাই চারশ বছরের এই হাট শুধু একটি মৌসুমি আয়োজন নয়; এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, দুর্গাপূজার ঐতিহ্য এবং বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের জীবন-জীবিকার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কটিয়াদীর এই ঐতিহ্য আরও বহু বছর ধরে টিকে থাকবে।

শেয়ারWhatsAppTelegramLinkedIn

এ সম্পর্কিত আরও খবর