আসন্ন ইউপি নির্বাচন : বর্তমানে ভোটারের চেয়েও দলীয় প্রতীক অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ
এম.এ. বাকী বিল্লাহ
স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূলের শাসন হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রাম চৌকিদারি আইনের ১৮৭০ এর অধীনে ইউনিয়ন পরিষদের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৫৭১টি ইউনিয়ন রয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে বলা হয় গণতান্ত্রিক চর্চার প্রাথমিক ও অতি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কিন্তু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে তা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবর্তে ব্যক্তিচর্চায় রূপান্তর হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন উন্মুক্তভাবে হওয়ার ধারা ভেঙে দলীয় প্রতীকে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন-সংক্রান্ত পাঁচটি আইন সংশোধন করা হয়। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের শুরুটা হয়েছে সিটি ও পৌরসভার মেয়র নির্বাচন দিয়ে। সর্বশেষ এটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রয়োগ করা হয়।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে কমে যায় ভোটারদের কদর। যোগ্য ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়েন। কারণ তাদের পক্ষে তখন বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট দলীয় ব্যক্তিকে অতিক্রম করে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার দেখা যায়, দলীয় মনোনয়নের কারণে দলীয় নির্দেশ মানতে গিয়ে উক্ত দলের অন্যান্য নেতাকর্মীদের প্রতিপক্ষ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু হওয়ার পরবর্তী সময়ে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানে নির্বাচনে জয়ী হওয়া। সেই ধারণা থেকেই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য মফস্বল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ছুটাছুটি শুরু হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ব্যাপক অর্থ বাণিজ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের প্যাকেজ চলে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। অপরদিকে ভোটাররাও অবহেলিত থাকে, একইসাথে তারা বিশ্বাস করে যে তাদের ভোটের কোনো গুরুত্ব নেই, কে চেয়ারম্যান হবে সেটা কেন্দ্র-ই নির্ধারণ করে দিবে!
তারপরও নির্বাচনে কিছুটা হলেও প্রাণ থাকে মেম্বার ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচনে পূর্বের ন্যায় ভোট দিতে পারার সুযোগ থাকায়। বলা বাহুল্য যে, চেয়ারম্যান পদেও ভোট দেয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন প্রাপ্ত ব্যক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় ক্ষমতার প্রভাবে ভোট-এলাকায় একধরনের পেশীশক্তির ব্যবহার করায় উক্ত পদে ভোটদানে ভোটারদের তেমন আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না।
নির্বাচনের পূর্বমুহুর্তে চলে সারাদেশে মনোনয়ন বাণিজ্য। টাকা, আধিপত্য এবং সম্পর্কের খাতিরে ওয়ান স্টার, টু স্টার, ত্রিস্টার মার্ক দিয়ে প্রার্থীদের নাম পাঠানো হয় কেন্দ্রে। সেখান থেকে একজন মনোনীত হওয়ার পরে সে তার নির্বাচনী এলাকায় প্রচারে নামেন। যদিও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রায়ই নিশ্চিত থাকেন যে, তিনিই চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হবেন, সবকিছুই শুধুমাত্র ফর্মালিটি। এতে করে যিনি প্রকৃত অর্থেই চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ছিলেন, তখন আর তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস ও ইচ্ছে কোনোটাই করেন না। এইভাবে দিনেদিনে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র চর্চার আতুরঘরে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে সাধের গণতন্ত্র।
স্থানীয় শাসনের নির্বাচন ব্যবস্থায় যখন থেকে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দেয়া শুরু হয়েছে, তখন থেকেই ভোটার ও যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচন বিমুখ হচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দলের মার্কার আড়ালে নির্মমভাবে হরণ হচ্ছে ভোটের অধিকার। সময়ের সাথে সাথে তা ভয়াবহ অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে একটা সময়ে আসবে যে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন প্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হয়ে নির্বাচন করার লোক খুজে পাওয়া যাবে না৷ তখন কীসের জনসমর্থন! কীসের ভোট! দলীয় মনোনয়ন পাওয়া মানেই চেয়ারম্যান হিসেবে সিলেকশনে নির্বাচিত হওয়া। যারফলে অনেক অযোগ্য লোক তৃণমূলের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পাবে। যার ক্ষতিকর প্রভাব পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গিয়ে পড়বে।
রাষ্ট্রের উচিত যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। সে লক্ষ্যে স্থানীয় শাসনের সকল নির্বাচনী ব্যবস্থায় দলীয় প্রতীক বরাদ্ধ দেয়ার আইন বাতিল করে তা সংশোধন করা। আসন্ন ইউপি নির্বাচনে সময়ের স্বল্পতার জন্য তা করা সম্ভব না হলেও পরবর্তী স্থানীয় নির্বাচনের আগে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের স্বার্থে সেবিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া অতীব জরুরি। তবে মফস্বলে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিগণ চাইলেও তারা তাদের নিজেদের এলাকায় যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচিত করার লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে আসন্ন ইউপি নির্বাচন সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারেন। এতে করে সাধারণ জনগণের কাছে ব্যক্তি ও নির্বাচন উভয়ের গ্রহণযোগ্যতা অধিকতর বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে।
নির্বাচন হোক ব্যালেটের সাথে ব্যালেটের। প্রতিযোগিতা হোক নেতৃত্ব ও যোগ্যতার। তবেই মূল্যায়ন পাবে ভোটার ও নির্বাচনী এলাকা। লাভবান হবে স্থানীয় শাসন তথা পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা।
এম. এ. বাকী বিল্লাহ
তরুণ লেখক, সংগঠক এবং
প্রোগ্রাম অফিসার
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।


