নমিতার পৃথিবী শুধু মা আর তিনি
# নিজস্ব প্রতিবেদক :-
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর ইউনিয়নের হাওরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি ঘর। ঘরে একটি বিছানা, কয়েকটি রান্নার সামগ্রী আর অতি সামান্য কিছু আসবাব। এই ঘরেই ৮০ বছরের বৃদ্ধ মাকে নিয়ে বসবাস করেন ৩৫-৩৬ বছর বয়সী নমিতা। একসময় কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ব্যবসায় লোকসান হয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে যোগ হয়েছে অসুস্থতা। পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়েছে। প্রচণ্ড ব্যথায় কষ্ট পেলেও চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। মায়ের ওষুধের খরচ জোগাড় করাও তাঁর জন্য কঠিন। কখনো কখনো তিনবেলা খাবারও জোটে না।
সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার কাছে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন নমিতা। কাঁদতে কাঁদতেই বলছিলেন তাঁর জীবনের গল্প। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেশি পড়াশোনা করার সুযোগ না পেলেও চমৎকার বাচনভঙ্গিতে নিজের কষ্টের কথাগুলো সাজিয়ে বলছিলেন তিনি।
সেদিন তাঁর কথা শুনে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নমিতার বৃদ্ধ মায়ের ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু পরে মনে প্রশ্ন জাগে নমিতা সেদিন কি সত্যিই তাঁর জীবনের সব কথা বলেছিলেন? তাঁর কষ্টের কথাগুলো কি বাস্তব, নাকি অসহায়ত্বের মুহূর্তে বলা কিছু কথা?
উত্তর খুঁজতে পৌঁছানো হয় গুনধর ইউনিয়নের হাওরপাড়ের সেই বাড়িতে।
কিছুটা পথ গাড়িতে, এরপর নৌকায় হাওর পেরিয়ে, তারপর আরও কিছুটা পথ হেঁটে পৌঁছাতে হয় নমিতাদের বাড়িতে। সঙ্গে নেওয়া হয় সামান্য কিছু বাজার-সদাই।
বাড়িতে পৌঁছেই চোখে পড়ে অসহায় বাস্তবতার চিত্র। ছোট্ট একটি ঘর। একটি বিছানা। কয়েকটি রান্নার সরঞ্জাম। আর সেই ঘরেই নমিতা ও তাঁর বৃদ্ধ মা।
সেদিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে নমিতা বলেছিলেন, স্যার, আমি বিয়ে করিনি। আমার জন্য আমার মা, আর আমার মায়ের জন্য আমি।
হাওরের নির্জন সেই ঘরে দাঁড়িয়ে কথাটির গভীরতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিজের চিকিৎসা নেই। সংসারে কোনো নিয়মিত উপার্জন নেই। ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারপরও নিজের কষ্টের চেয়ে বৃদ্ধ মায়ের ওষুধের চিন্তাই যেন তাঁর কাছে বড়।
নমিতার জীবনের চাওয়া-পাওয়াও খুব সীমিত। মা যেন বেঁচে থাকেন। মায়ের ওষুধ যেন বন্ধ না হয়। আর কোনোভাবে দুবেলা খাবার যেন জোটে।
হাওরের এক প্রান্তের এই ছোট্ট ঘরটি যেন সমাজের চোখের আড়ালে থাকা অসংখ্য অসহায় জীবনের প্রতিচ্ছবি। চারপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের দুঃখ-কষ্ট নীরবে জমে থাকে, নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় তাদের খবর খুব কমই পৌঁছায়।
নমিতার পাশে দাঁড়াতে ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন, করিমগঞ্জ সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা, সম্ভব হলে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাকে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদের প্রতিও রয়েছে মানবিক হওয়ার আহ্বান। আশপাশের অসহায় মানুষের দিকে একটু নজর দিলে, সামান্য সহযোগিতাও কারও জীবনে বড় আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
নমিতার গল্প শুধু একজন অসহায় নারীর গল্প নয়, এটি একজন সন্তানের মায়ের প্রতি দায়িত্ব, মমতা ও ত্যাগের গল্প। নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে পাশে সরিয়ে রেখে বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ আর দুবেলা খাবারের চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।
ফিরে আসার সময় একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে নমিতা সেদিন মিথ্যা বলেননি। তাঁর কান্না অভিনয় ছিল না। তাঁর কষ্ট কোনো গল্পও ছিল না। হাওরের সেই ছোট্ট ঘর, অসুস্থ শরীর আর বৃদ্ধ মায়ের পাশে বসে থাকা নমিতাই তাঁর প্রমাণ।
নমিতার মতো মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের মানবিক দায়িত্বও। মানুষের জন্য মানুষ এই হোক আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয়।




