ভৈরবে চাঁদের হাটের প্রতিষ্ঠাতা রফিকুল হক দাদুভাইয়ের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
#মোস্তাফিজ আমিন :-
শিশু–কিশোর ও যুব কল্যাণ সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বিশিষ্ট সাংবাদিক, কবি, ছড়াকার ও নাট্যকার রফিকুল হক দাদুভাইয়ের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। এ উপলক্ষে শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে চাঁদের হাটের ভৈরব শাখার উদ্যোগে আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, দোয়া মাহফিল ও তাবারক বিতরণের আয়োজন করা হয়।
শহরের কমলপুর মোজাফফর বেপারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জালাল আহমেদ। এতে বক্তব্য ও স্মৃতিচারণ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক মোস্তাফিজ আমিন, ফারহানা বেগম লিপি, নিজাম উদ্দিন, জেহাদ তালুকদার, মিলন রানী বর্মণ, সুরভী খাতুন, সাবিনা আক্তার, সাথী বেগম, মনির হোসেনসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য। আলোচনা শেষে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয় এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে তাবারক বিতরণ করা হয়।
রফিকুল হক দাদুভাই ছিলেন বাংলাদেশের শিশু–কিশোর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক পরিচিত নাম। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও নাটক রচনার পাশাপাশি সাংবাদিকতা এবং শিশু–কিশোরদের সংগঠিত করার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে শিশু–কিশোর ও যুব কল্যাণ সংগঠন ‘চাঁদের হাট’, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশু–কিশোরদের সৃজনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রত্যয়ে কাজ করে আসছে।
১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি রংপুর শহরের কামালকাচনায় জন্মগ্রহণ করেন রফিকুল হক। তাঁর স্কুল ও কলেজজীবন কাটে রংপুরে। কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি শিশু সংগঠন মুকুল ফৌজের সঙ্গে যুক্ত হন। কৈশোর থেকেই লেখালেখি, নাটক ও আবৃত্তির প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ।
পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। প্রথমে অধুনালুপ্ত দৈনিক আজাদ এবং পরে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় সহসম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। একই সময়ে শিশু–কিশোরদের জন্য ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও নাটক রচনায় মনোনিবেশ করেন।
দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার শিশুদের পাতা ‘চাঁদের হাট’-এর দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ‘দাদুভাই’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাতাটি দৈনিক বাংলায় স্থানান্তরিত হলে তিনি এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। শিশু–কিশোরদের সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৪ সালের ১৫ এপ্রিল, পয়লা বৈশাখ, তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় শিশু–কিশোর ও যুব কল্যাণ সংগঠন ‘চাঁদের হাট’।
‘আমরা সুন্দর হবো’—এই স্লোগানকে ধারণ করে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটির মূলমন্ত্রে রয়েছে সূর্যের সঙ্গী হওয়া, দেশের মাটিকে ভালোবাসা, চাঁদের হাটকে একটি মিষ্টি পরিবার হিসেবে গড়ে তোলা এবং বিশ্বমানবতাকে আপন করে নেওয়ার শিক্ষা।
দীর্ঘ কর্মজীবনে রফিকুল হক দাদুভাই সাংবাদিকতার পাশাপাশি শিশুসাহিত্যে অসংখ্য ছড়া, গল্প, উপন্যাস ও নাটক রচনা করেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা অনেক। ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাতীয় পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। শিশু–কিশোরদের জন্য প্রকাশিত জাতীয় সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’র সম্পাদক হিসেবেও অর্জন করেন খ্যাতি। এ ছাড়া দৈনিক জনতা, দৈনিক রূপালী ও দৈনিক যুগান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে দাদুভাইয়ের দুই স্ত্রী হামিদা হক (প্রয়াত) ও ফাতেমা হক। জয়, জ্যোতি, জীবন ও জয়ীতা—তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন তিনি।
বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পরও শিশু–কিশোরদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন ভক্ত, সহকর্মী ও সংগঠনের সদস্যরা।




